শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ০৫:০৯ অপরাহ্ন

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একজন খাঁটি বাঙালি ও নিষ্ঠাবান মুসলমান

ডেস্ক রির্পোট ->> / ৫৩ বার পঠিত
সময়: শুক্রবার, ১৬ জুলাই, ২০২১, ৮:০৭ অপরাহ্ণ

সংবাদটি শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আজ থেকে ১৩৬তম জন্মদিন। এ দিনে তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে মাথায় নানা প্রশ্ন ভিড় জমায়; প্রশ্ন আসে তিনি কিসে বড়? বাঙালিত্বে, মুসলমানিত্বে, না মনুষত্বে? যদিও এককথায় এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন, তবুও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তিনি সবকিছুতেই বড় ছিলেন। অন্ধের হস্তীদর্শনের মতো আমরা সাধারণ বোধ-বিবেচনা নিয়ে তাঁর জীবন, চিন্তা ও কর্মের যেদিক পর্যালোচনা করি, সেদিকই বড় বলে মনে করি। এগুলোর মধ্যে তুলনা করলে তাঁর বাঙালি সত্তাটিকে আবার বেশি বড় বলে মনে হয়। কারণ, বাঙালিত্বের পরাকাষ্ঠায় তিনি সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।

 

এর প্রমাণ আছে তাঁর কথায়, লেখায় এবং কাজে। মুসলিম লীগের দোর্দণ্ড প্রতাপের কালে, প্রবল বৈরী স্রোতে দাঁড়িয়েও তিনি দৃঢ় চিত্তে উচ্চারণ করেছিলেন : ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙ্গালী। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য।

মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’ কেবল কথায় বা লেখায় নয়, এ বিশ্বাস তিনি চেতনার গভীরে লালন করেছেন। ফলে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে যখন বাদানুবাদ সৃষ্টি হয়, তখন তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন শুরুর বহু আগে থেকেই বাংলা ভাষার পক্ষে তিনি অবতীর্ণ হন ওকালতির ভূমিকায়।

এ ভাষা যে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা এবং এর চর্চা এবং বিকাশের ভেতর দিয়েই যে বাঙালি মুসলমানের জাতীয় চেতনা জাগ্রত হতে পারে—এ কথা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের আলোয় ভারতবর্ষের মুসলামানদের জাগ্রত করতে ১৯১১ সালে সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’।

তরুণদের চেতনা শানিত করতে বারবার বলেছেন : ‘তোমরা বাঙালী, তোমরা বাঙালী মুসলমান। বাঙলার আবহাওয়ায়, বাঙলার মাটিতে, বাঙলার শস্যে, বাঙলার ফলে তোমাদের দেহ গঠিত, পুষ্ট, বর্দ্ধিত। … জানিও দেশের সুখ-দুঃখ শুভাশুভের সহিত তোমাদের সুখ-দুঃখ, শুভাশুভ এক নাড়ীতে বাঁধা। তোমাদের জন্মভূমিও তোমাদের নিকট কিছু আশা রাখে।’ এভাবে বাঙালি এবং বাংলার তরুণ ও যুবসমাজকে জাগ্রত করতে তিনি একের পর এক রচনা করেছেন ‘আমাদের সাহিত্যিক দরিদ্রতা’, ‘আমাদের ভাষাসমস্যা’, ‘বাংলা সাহিত্য ও ছাত্রসমাজ’, ‘ভারতের সাধারণ ভাষা’ প্রভৃতি প্রবন্ধ।

তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন বাংলা ভাষার সঙ্গে বাঙালির অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। সেজন্যে তিনি এ ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৯১৭ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মিলনে’র দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষা চাই-ই।’ একইভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দেন—‘মাতৃভাষার উন্নতি ব্যতীত কোনও জাতি কখনও কি বড় হইতে পারিয়াছে?’ বাংলা-উর্দু বিতর্কে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

 

 

১৩২৭ বঙ্গাব্দে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে আয়োজিত এক সভায় ভারতের বিভিন্ন ভাষার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবির যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করে বলেন, সাহিত্যের শক্তির দিক থেকে একটি মাত্র ভাষা ভারতের রাষ্ট্রভাষা হওয়ায় দাবি রাখে, সেটি হলো বাংলা ভাষা। দেশভাগের প্রাক্কালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দীন আহমদ উর্দুকে ভাবী রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার করার পক্ষে যে বাণটি ছুড়ে দিয়েছিলেন, সেটি প্রতিহত সবচেয়ে ধারালো যুক্তি তুলে ধরেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।

তিনি লেখনীকে যেমন প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অস্ত্র বানিয়েছিলেন, তেমনি বজ্রমুষ্ঠি তুলে রাজপথে নেমে স্লোগান দিয়েছেন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ‘দৈনিক আজাদ’ সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৯৪৮ সালে ৪ মার্চ বগুড়ার আলতাফুন্নেসা মাঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে হাজার হাজার লোকের যে সমাবেশ হয়েছিলো, তাতে সভাপতিত্ব করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। তখন তিনি আযিযুল হক কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। রোমান এবং উর্দু হরফে বাংলা প্রচলনে পাকিস্তান সরকার যে অপতৎপরতা চালায় তিনি তার ঘোর বিরোধিতা করেন।

১৯৫১ সালের ১৫ মার্চ কুমিল্লা শিক্ষা-সম্মেলনে গিয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এক অভিভাষণে বাংলা ভাষা অবহেলিত হলে বিদ্রোহ করবেন বলে ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে এও বলেন, পূর্ববঙ্গে নতুন ভাষা জোর করে চাপালে সেটা হবে গণহত্যার শামিল। কী তার দূরদৃষ্টি! এর মাধ্য ২০ বছর পরে পূর্ববঙ্গের মানুষ পাকিস্তানি হায়না ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে ভয়ংকর গণহত্যার শিকার হন। ঐ সময় সিলেটের ‘নও-বেলাল’ এবং কলকাতার ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় তাঁর এ বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়; আগ্রহীরা দেখতে পারেন ২৩ মার্চ ১৯৫১-এর ‘নও-বেলাল’ এবং ৩০ মার্চ ১৯৫১-এর ‘যুগান্তর’। বায়ান্নতে এসেও তাঁর প্রতিবাদী চেতনায় পরিবর্তন আসেনি; বরং তাতে প্রবল শক্তি সঞ্চারিত হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পর হতাহতদের দেখতে তিনি হাসপাতালে ছুটে যান। শুধু কী তাই, শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করতে তিনি নিজের কালো আচকান কেটে হাতে বেঁধে শোকজ্ঞাপন ও প্রতিবাদ করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিমের হামলায় আহত ছাত্রদের শুশ্রূষায়ও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সেই বয়াল দিনের স্মৃতিচারণ করে আবদুল গাফফার চৌধুরী লিকেছেন : ‘আমরা যখন কার্জন হলের সামনে তখন মিছিলের ওপর গুলি, লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ছোড়া আরম্ভ হয় এলোপাতাড়িভাবে। … তখন প্রাণভয়ে আমরা কার্জন হলে ঢোকার চেষ্টা করি। … আমি লাফ দেবার আগেই পুলিশ এসে-গিয়েছিল। তারা আমার পায়ে লাঠিচার্জ করে। ডান পায়ে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। … আমাকে ওরা (পুলিশ) টেনে কার্জন হলের ভেতরে নিয়ে যায়। আমি ফিট হয়ে গিয়েছিলাম। যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো তখন দেখলাম ডক্টর শহীদুল্লাহ্ আমার পায়ের কাছে বসে আছেন। তিনি নিজ হাতে আমার পায়ে বরফ ঘষে দিচ্ছেন। আমি খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম।

 

 

 

বাংলা ভাষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করায় মুসলিম লীগ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা ড. শহীদুল্লাহকে ‘ট্রেইরর পণ্ডিত’ বলতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু সেসব তিনি তোয়াক্কা করেননি। কেবল বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান কিংবা রাজপথের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেই নয়, বাংলা ভাষার সুলুক-সন্ধান, ‘চর্যাপদে’র কালনির্ণয় ও তত্ত্ব-বিশ্লেষণ, বাংলা সাহিত্যের বিচিত্র দিকের গভীর অধ্যয়ন-অন্বেষণ এবং বাংলা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়নসহ বিভিন্ন দুরূহ কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন, যার অনেকগুলোই এখন বাঙালির চিরায়ত সম্পদ হয়ে উঠেছে। তাঁর সেসব গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘সিদ্ধা কানুপার গীত ও দোহা’, ‘ভাষা ও সাহিত্য’, ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’, ‘আমাদের সমস্যা’, ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’, ‘বিদ্যাপতি শতক’, ‘বাংলা আদব কী তারিখ’, ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’, ‘বৌদ্ধ মরমীয় গান’ প্রভৃতি। তাঁর সম্পাদিত ‘আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ ধ্রুপদী গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে।

বহু ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন এবং বাঙালিত্বের পরাকাষ্ঠা দেখালেও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ধর্মবিমুখ ছিলেন না। বংশ-পরম্পরাগতভাবে তাঁরা ছিলেন পীর গোরাচাঁদের খাদেম। এই সূত্রে শহীদুল্লাহ্ আজন্ম আধ্যাত্মিক পরিবেশে লালিত হয়েছেন এবং আমৃত্যু নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মপালন করেছেন। তবে তিনি কূপমণ্ডুক বা বকধার্মিক ছিলে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর অসংখ্য ভক্ত ও মুরিদ ছিলো, এখনো আছে। ভক্তদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি ধর্মসভা করেছেন জেলায় জেলায়। তাঁকে ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক মিলাদ অনুষ্ঠান যেন পূর্ণতা পেত না।

তাঁর লেখনীতেও স্থান পেয়েছে ধর্মের নানাদিক। আল্লাহ, কোরআন, নবী-রসুল ও আউলিয়াদের নিয়ে তিনি রচনা করেছেন—মহানবী, বাইঅতনামা, কুরআন প্রসঙ্গ, মহররম শরীফ, ইসলাম প্রসঙ্গ, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে শেষ নবী প্রভৃতি গ্রন্থ। গ্রন্থগুলো তাঁর ধর্মনিষ্ঠার গভীরতায় প্রোজ্জ্বল। কর্মজীবনে তিনি সফল ছিলেন; শুরু করেছিলেন যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে, এরপর কিছুদিন বসীরহাটে ওকালতি করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ চৌধুরী তাঁকে নিযুক্ত করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা-সহকারী পদে।

 

 

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। বগুড়া আজিজুল হক কলেজের তিনি অধ্যক্ষ ছিলেন,—ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। কর্মে যেমন নিপুণ, তেমনি সংসারধর্মের ছিলেন দায়িত্বশীল। গবেষণা ও সাধনার স্বীকৃতি-স্বরূপ জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর লাভ করেছেন জাতীয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ ও ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ (মরণোত্তর) খেতাবে ভূষিত করে, বাংলাদেশ সরকার দেয় একুশে পদক (মরণোত্তর)। ফরাসি সরকারও তাঁকে সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদান করে ডি-লিট উপাধি। তাঁর মতো গভীর অনুধ্যানী-অনুসন্ধানী এবং মননশীল পণ্ডিত কোনো জাতির মাঝে শতাব্দীতেও একজন জন্মায় না। সেদিক থেকে বাঙালি সৌভাগ্যের অধিকারী।

জ্ঞান-সাধনায় এবং আচরিত জীবনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের আইকন। জীবনাভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ এই জ্ঞানতাপস মনীষীর মনুষ্যত্বও জাতিকে পথ দেখিয়েছে। তাঁকে বলা হয় ‘পূর্ণ মানব’। নিজধর্মে নিষ্ঠাবান থেকেও বৃহত্তর মানবধর্ম এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্মুন্নত রাখায় সদা তৎপর ছিলেন। দীর্ঘজীবনের অধিকারী এই সাধক-পুরুষ কখনও সুবিধাবাদের কাছে নিজের বিবেককে বিকিয়ে দেননি।

ছিলেন সত্যভাষী, প্রিয়ংবদ, কর্তব্যে অবিচল এবং কঠোর পরিশ্রমী। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে ছিলেন সৎ ও নিষ্কলঙ্ক। বিবেকবান এবং সত্যবাদী এমন মানুষ সকল কালের সকল সমাজে অনুসরণযোগ্য। তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গের বাঙালি বুদ্ধিজীবীকুলের শিরোমণি। পাকিস্তানবাদী ভাবধারার বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঝান্ডা হাতে সব সময় পথ চলেছেন। বাঙালিদের এই চেতনার ভিত মজবুত করা এবং স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা-সংগ্রামে পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অগ্রপথিকের।

মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের আত্মপরিচিতি আবিষ্কারে এবং স্বাজাত্যবোধ ও স্বাদেশিকতার উদ্বোধনে একটি অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।’ বাস্তবেই বাঙালির আত্মপরিচয় আবিষ্কারে তাঁর অবদান অপরিসীম। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাধনায়, বাঙালির মনন-নির্মাণে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পথ প্রশস্তকরণে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা কোনোদিনইচর-স্মরণীয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তাঁর অবদানকে এ কালের মানুষ যতটা স্মরণ করার কথা ততটা করে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর জীবন ও কীর্তিগাথা তুলে ধরার কোনো প্রয়াস নেই বললেই চলে। তাঁর সমাধিস্থলটি পর্যন্ত রয়েছে সীমাহীন অযত্ন-অবহেলায়। হতভাগা এই দেশে গুণীর কদর নেই সেটা তিনি জীবদ্দশাতেই উপলব্ধি করেছিলেন। পাকিস্তান সরকার তাঁকে সে-মর্যাদা দেয়নি, যেটা তাঁর প্রাপ্য ছিলো।

 

 

মৃত্যুর পূর্বে এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, আমার কথা লিখতে চাইলে লিখে দিয়ো, তিনি দ্রুতই বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছেন! না, তাঁর এই অভিমানভরা উক্তি বাঙালি গ্রহণ করেনি। তিনি বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাননি, যাবেন না কখনও। এখনও তিনি কিংবদন্তি বাঙালি বুদ্ধিজীবী। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধ ও গ্রন্থ পঠন-পাঠন করা হয়; তাঁর জীবন, কর্ম ও সাধনা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা হচ্ছে; এমনকি সাধারণ মানুষ পর্যন্ত আজও তাঁকে ভক্তি-শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। তাঁর মতো ‘পূর্ণ মানব’ বা ‘ইনসান্-আল্-কামিল’কে বাঙালি কোনোদিন ভুলবে না। তাঁর কালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মনীষী হিসেবে তো বটেই; এ কালের বাঙালিরাও তাঁকে প্রজ্ঞাদীপ্ত মনীষী হিসেবে শ্রদ্ধা করে। করবেই তো, কারণ—শ্রদ্ধা তিনি লাভ করেছেন আপন গুণ ও কর্মের দ্বারা।

কেবল এক কালে নয়, শিষ্য-পরম্পরা তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ-যুগান্তর ধরে। তাঁর সুযোগ্য শিষ্য আনিসুজ্জামান বলেছেন, শহীদুল্লাহ ‘গজদন্তমিরারবাসী পণ্ডিত’ ছিলেন না’, ছিলেন সমাজ ও মানুষ-সংলগ্ন এক দরদি পণ্ডিত। নতুন প্রজন্ম এই পণ্ডিতের জীবনদর্শন, পাণ্ডিত্য ও চিন্তার আলোয় আলোকিত হোক; নানাবিধ অবক্ষয়ের অতলে ডুবে থাকা সমাজ তাঁকে গ্রহণ করুক আইকন হিসেবে। এই খাঁটি বাঙালি, নিষ্ঠাবান ধার্মিক এবং উদার মানবতাবাদী চিন্তকের দেখানো পথই হোক তাদের চলার পথের দিশা; তাদের চিত্তদুয়ারে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আদর্শ প্রজ্বলিত থাকুক অনির্বাণ শিখা হয়ে।


সংবাদটি শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও সংবাদ

ফেসবুকে আমরা

Theme Customized By Theme Park BD